ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ট্রাস্টি বিজিআইসির গাফিলতিতে সংকটে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত : কঠোর শাস্তির দাবি

২০২৬ জুন ২২ ০৯:৫৮:৫৩
ট্রাস্টি বিজিআইসির গাফিলতিতে সংকটে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত : কঠোর শাস্তির দাবি

সারাবিশ্বের শেয়ারবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এক কলঙ্কিত খাত। যা নিয়ে সবসময় অ্যাসেট ম্যানেজারদের দোষারোপ করা হয়। অথচ ট্রাস্টির কাঁধেও বড় দায়িত্ব। অন্যদের সঙ্গে তাদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত এখন অভিষাপের নাম। এক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাধারন বীমা কোম্পানি (বিজিআইসি)। এই কোম্পানিটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। তবে সেটা যথাযথভাবে পরিপালন না করায় দেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাত শেষ হয়ে গেছে। এজন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এরইমধ্যে দুই দফায় বিজিআইসিকে ৪ কোটি টাকার শাস্তি দিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে সতর্ক করেছে।

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি হলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি স্বাধীন সত্তা। যা বিএসইসি (বিএসইসি) এর বিধিমালা অনুযায়ী সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির (এএমসি) কার্যক্রম তদারকি এবং ট্রাস্ট ডিড অনুযায়ী ফান্ডের সঠিক পরিচালনা নিশ্চিত করে। এছাড়া কাস্টডিয়ানের কাছে থাকা সম্পদও ঠিকঠাক আছে কিনা, তা তদারকি করা ট্রাস্টির দায়িত্ব।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০০১ এ-ট্রাস্টির দায়-দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই বলা হয়েছে- ট্রাষ্ট পরিচালনার সহিত সম্পর্কিত যে কোন তথ্য সম্পদ ব্যবস্থাপকের নিকট হইতে প্রাপ্তির অধিকার ট্রাস্টির থাকিবে এবং ট্রাস্টি সম্পদ ব্যবস্থাপকের নিকট সময় সময় সাময়িক প্রতিবেদন চাহিতে পারিবে। এছাড়া কোন ট্রাস্টি যদি কখনও মনে করে যে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট আইন বা এই বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হইতেছেনা তাহা হইলে, তৎক্ষণাৎ উক্ত ট্রাস্টিপরিস্থিতি সংশোধনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ বকরিবে এবং কমিশনকে তৎসম্পর্কে অবহিত করিবে। এমনকি ট্রাস্টি ট্রাস্টের পক্ষে কোন অর্জন ও হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল দলিল সম্পাদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করিবে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কর্তৃক লেনদেন যেন যথাযথভাবে এবং এই বিধিমালা অনুসারে সম্পাদিত হয় তাহা নিশ্চিত করিবে। সম্পদ ব্যবস্থাপক কর্তৃক এই বিধিমালা মেনে চলার জন্য ট্রাস্টিও দায়ী থাকবে।

মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিভাগের দায়িত্ব পালন করা বিএসইসির সাবেক এক কমিশনার আগামীর সময়কে বলেন, ট্রাস্টির দায়িত্ব অনেক। আইনে তাদের দায়িত্ব ভালোভাবেই দেওয়া আছে। এরা যেমন অডিটিং করে, তেমনি কাস্টডিয়ানের কাছে থাকা সম্পদের সঠিকতাও যাচাই করে। ট্রাস্টি অনেকটা অ্যাসেট ম্যানেজার ও কাস্টডিয়ানের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ রাখে এবং কোনকিছুর ব্যত্যয় ঘটলে, তা শোধরাতে ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সমস্যা পেয়েছেন। যেখানে ট্রাস্টির অনেক ব্যর্থতা ও গাফিলতি উঠে আসে। এগুলোর রিপোর্ট করা হয়েছিল। পরবর্তী কমিশন সেটাকে কিভাবে দেখছে এবং কি ব্যবস্থা নিচ্ছে, এটা তারা ভালো বলতে পারবে।

এ থেকেই বোঝা যায় মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ট্রাস্টির দায়িত্ব কত বড়। অথচ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ফান্ডের ট্রাস্টি হলেও বিজিআইসি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করেনি। তারা অ্যাসেট ম্যানেজারদের স্বার্থ দেখেছে। আর অ্যাসেট ম্যানেজারদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা অপকর্মকে আড়াল করেছে।

তবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিজিআইসির অপকর্মকে সামনে নিয়ে এসেছে। এরইমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার দায়ে ২ দফায় ৪ কোটি টাকা জরিমানা করেছে।

বিজিআইসির ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ি, প্রতিষ্ঠানটি ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তালিকাভুক্ত ১৩টি ফান্ড হচ্ছে- এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ইবিএল এনআরবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, রিলায়েন্স ওয়ান, ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স মিউচ্যুয়াল ফান্ড ওয়ান ও এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ফান্ড।

অতালিকাভুক্ত ৫ মিউচ্যুয়াল ফান্ড হচ্ছে- প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল ফার্স্ট ইউনিট ফান্ড, রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, সন্ধানী লাইফ ইউনিট ফান্ড, সিএপিএম ইউনিট ফান্ড ও এমটিবি ইউনিট ফান্ড।

বিজিআইসির ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তালিকাভুক্ত ফান্ডগুলোর চিত্র :

ফান্ডের নাম

পরিশোধিত মূলধন

(কোটি টাকা)

ইউনিট দর

(টাকা)

এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড

১০৮.৫০

৪.৪০

এলআর গ্লোবাল ফান্ড ওয়ান

৩১১.০৮

৩.২০

এআইবিএল ফার্স্ট ফান্ড

১০০.০০

৪.০০

এমবিএল ফার্স্ট ফান্ড

১০০.০০

৪.০০

ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড

১২০.০০

৪.৭০

গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড

১৫০.০০

৩.৩০

পপুলার লাইফ ফার্স্ট ফান্ড

২৯৯.১০

৩.০০

পিএইচপি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড

২৮১.৮৯

৩.২০

ইবিএল এনআরবি ফান্ড

২২৪.২৬

৩.০০

এবি ব্যাংক ফার্স্ট ফান্ড

২৩৯.০৯

৩.৩০

রিলায়েন্স ওয়ান

৬০.৫০

১১.৭০

ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফান্ড

১০৪.৩০

৭.১০

এসইএমএল লেকচার ইক্যুইটি

৫০.০০

৭.৪০

মোট ১৩টি ফান্ড

২১৪৮.৭২ কোটি টাকা

গড় দর ৪.৭৯

দেখা গেছে, ২ হাজার ১৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ১৩টি তালিকাভুক্ত মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিজিআইসি ট্রাস্টির দায়িত্ব পালন করছে। অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মে ওইসব ফান্ডের ইউনিট দর এখন অর্ধেকেরও তলানিতে। ১০ টাকা অভিহিত ও ইস্যু মূল্যের ফান্ডগুলোর ১১ এপ্রিল গড় দর দাঁড়িয়েছে ৪.৭৯ টাকায়।

ট্রাস্টি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এই বিজিআইসি। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির কাঁধে লাখো বিনিয়োগকারীর কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষার দায়িত্ব। যা সুরক্ষা দিতে না পারায় বিনিয়োগকারীরাসহ পুরো শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাই এ প্রতিষ্ঠানটিকে শাস্তির আওতায় আনতে বাধ্য হয়েছে বিএসইসি।

জানা গেছে, এল.আর গ্লোবালের পরিচালিত ৬টি মিউচুয়াল ফান্ডের যথাযথ তদারকি ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি বিজিআইসিকে গত বছরের ২১ অক্টোবর ৩ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

মিউচুয়াল ফান্ডগুলো হলো- এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড এবং গ্রিন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড।

এছাড়া ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স ফান্ডের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম হয়েছে, সেখানেও বিজিআইসি ট্রাস্টি হিসেবে যথাযথ তদারকি ও দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিজিআইসিকে ১.০০ (এক) কোটি টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।

গত বছরের ২৩ জুলাই বিএসইসির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স ফান্ড থেকে ২০১৭ সালে এএফসি হেলথে ৪.০০ (চার) কোটি টাকা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘিত হয়। এতে ফান্ডটির ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ওই অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার পেছনে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে বিজিআইসি যথাযথ তদারকি ও দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিজিআইসিকে ১.০০ (এক) কোটি টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।

সম্প্রতি সিকিউরিটিজ আইন ও যথাযথ তদারকিতে গাফিলতির অভিযোগে এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনারস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বিজিআইসি) ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) সতর্ক করেছে কমিশন। এরমধ্যে বিজিআইসিকে এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনাধীন এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। আর আইসিবিকে এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনাধীন এটিসি শরীয়াহ ইউনিট ফান্ডের ট্রাস্টি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনায় বিধি-বিধান লঙ্ঘনের দায়ে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে বিজিআইসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমাদের অধীনে ৩৪টি ফান্ড রয়েছে। আর বিধিমালা অনুযায়ি, ফান্ডের সুরক্ষার দায়িত্ব এবং ফান্ডের সম্পদ ও অর্থ হেফাজতে রাখার দায়িত্ব ট্রাস্টির না।

শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ট্রাস্ট দলিল অনুযায়ি ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে ট্রাস্টির ভূমিকা থাকে না। কেবল তাই না, ২০১৭ সালে বিনিয়োগের আগে ভ্যানগার্ড বিএসইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে বিনিয়োগ করে। এ নিয়ে ট্রাস্টি বিজিআইসি ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিএসইসিকে নিয়মিত অবহিত করেছে। তবে এ নিয়ে ওইসময় প্রশ্ন তোলা হয়নি। তবে এখন বিএসইসি এখন কেনো এবং কি উদ্দেশ্যে বিজিআইসিকে দায়ী করছে, তা অবগত নই।

অথচ ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পরিচালিত ভ্যানগার্ড এএমএল রূপালি ব্যাংক ব্যালেন্সড ফান্ড থেকে এএফসি হেলথ লিমিটেড ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা সত্ত্বেও ওই ফান্ডের ট্রাস্টি ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) এখনো পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আনা হয়নি বলে জানান আহমেদ সাইফুদ্দীন চৌধুরী।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে