ঢাকা, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বিনিয়োগকারীদের আইপিওর টাকা নিয়ে লুব-রেফের ইউসুফ গ্যাংয়ের ভয়াবহ জালিয়াতি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৯ ০৯:৪৫:৪৯
বিনিয়োগকারীদের আইপিওর টাকা নিয়ে লুব-রেফের ইউসুফ গ্যাংয়ের ভয়াবহ জালিয়াতি

ভালো ব্যবসা দেখিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শেয়ারবাজারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রিমিয়ামে সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকার বিশাল অর্থ উত্তোলন করে লুব-রেফ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ। তবে ওইসময়ই ভূয়া মুনাফা ও সম্পদ দেখিয়ে এই বিশাল টাকা উত্তোলন করে। যে ভূয়া হিসাব দেখানো থেকে এখনো বেরোতে পারেনি লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ। যারা আইপিওর প্রায় পুরো টাকা গায়েব করে দিয়েছে ভূয়া সম্পদ কেনার তথ্যের আঁড়ালে। যা দিয়ে পরিচালকেরা রাজধানীর বসুন্ধরায় একাধিক ফ্লাট ক্রয়, সিঙ্গাপুরে অর্থ পাঁচারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছে।

লুব-রেফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ ও পরিচালক মো. সালাউদ্দিন ইউসুফের নেতৃত্বাধীন প্রতারক চক্রটি বিনিয়োগকারীদের বিশাল অর্থকে ভূয়া সম্পদ কেনার নামে নিজেদের স্বার্থে গায়েব করে দিয়েছে। যাতে কোম্পানিটি এখন ধুঁকে ধুঁকে কোনরকমে টিকে আছে। এই চক্রটি বিনিয়োগকারীদের টাকায় বসুন্ধরায় পরিচালকদের নামে একাধিক ফ্লাট কিনেছে। তবে বড় একটি অংশ সিঙ্গাপুরে বসবাসরত মেয়ের মাধ্যমে পাঁচার করেছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহযোগিতা করেছেন ইউসুফের মেয়ের শশুর বা বেয়াই সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির।

মোহাম্মদ ইউসুফ চক্র শেয়ারবাজারের বিতর্কিত ব্যক্তি ও আড়ালে থেকে এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের নেতৃত্ব দেওয়া কাজী সাইফুর রহমানের সহযোগিতায় আইপিওতে আসার আগে অনেক ভূয়া প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করে। যার একটি অংশ নিয়েছে সাইফুর চক্র। আর বেনামে অনেক শেয়ার নিয়েছে ইউসুফ গং।

এদের কারনে বিনিয়োগকারীরা আজ পথের ফকির। আইপিওতে ৩০ টাকা শেয়ার ইস্যু করা কোম্পানিটির শেয়ার দর এখন ৯.৫০ টাকা। এই লোকসান ও কোম্পানির পর্ষদের অর্থ আত্মসাতের কারনে কোম্পানির অফিস ও কারখানায় মব তৈরীর প্রস্তুতি নিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের একটি গ্রুপ। যারা মোহাম্মদ ইউসুফ চক্রকে কোম্পানি থেকে বিতারিত করাসহ আইনের আওতায় তুলে দিতে চায়। তবে পরিস্থিতি বাস্তবে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এখনই বলতে নারাজ ওই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ।

এই কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসে আর্থিক হিসাবে সমস্যা ছিল এবং প্রিমিয়াম পাওয়ার যোগ্য না বলে তৎকালীন কমিশনকে সতর্ক করেছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) এক নির্বাহি পরিচালক। যা কর্ণপাত না করে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানিটিকে শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

লুব-রেফ কর্তৃপক্ষের প্রতারণা নিয়ে ওইসময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং বিএসইসির সেই নির্বাহি পরিচালকের তথ্য আরেক দফায় প্রমাণিত হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ৫৮৪.৪০ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ আছে বলে উল্লেখ করেছে। তবে কোম্পানির শিফট ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতিতে সরেজমিনে যাচাইয়ে গিয়ে তারা ১১৪.৯২ কোটি টাকার সম্পদের হদিস পাননি।

শুধু এখানেই থেমে নেই লুব-রেফের প্রতারণা। এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোন নির্মাণ বা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস ছাড়াই টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভূয়া সম্পদ দেখিয়েছে। তারা আইপিওর টাকা দিয়ে প্রকল্প নির্মাণ করছে বা প্রকল্প কাজ চলমান হিসাবে ভূয়া তথ্য দিয়ে পুরো টাকা গায়েব করে দিয়েছে।

লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন আইপিও অর্থে নতুন প্রকল্প চালুর জন্য ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে ২১২.২৬ কোটি টাকা। এরমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৬.৭৩ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে বলে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিরীক্ষককে বুকস অব অ্যাকাউন্টস বা সাপোর্টিং রেকর্ডস এর বিস্তারিত দিতে পারেনি।

এরপরে নিরীক্ষক ওই সিডব্লিউআইপির সত্যতা যাচাইয়ে বিদ্যমান কারখানা এবং জুলদা প্রকল্পে সরেজমিনে পরিদর্শন করে। তবে এক্ষেত্রে নিরীক্ষক কোন নির্মাণ প্রকল্প বা ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস দেখতে পায়নি। এভাবে ভূয়া প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে আইপিওর টাকা।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সদুজনিত ৫ কোটি টাকার ব্যয়কে ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস হিসাবে সম্পদ দেখিয়েছে। কিন্তু ওই ৫ কোটি টাকা মূলত ব্যয় হিসাবে প্রফিট অর লস (ইনকাম স্টেটমেন্ট) দেখাতে হবে। যেহেতু ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস নাই।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে আইপিওতে টাকা সংগ্রহ করা কোম্পানিটির এখনো ১৩.১০ কোটি টাকা অব্যবহৃত রয়েছে। যা রাখা আছে ধংস হয়ে যাওয়া স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকে। যে অর্থ বেড়ে হয়েছে ১৯.৮৭ কোটি টাকা। এখন এই অর্থ ফেরত পাওয়ায় হয়ে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া দীর্ঘসময়ে ফান্ড ব্যবহার করতে না পারাকে প্রসপেক্টাসে বর্ণনার গুরুতর লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

এই কোম্পানিতে ২০২৫ সালের ৩০ জুন অবন্টিত লভ্যাংশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫.৯২ কোটি টাকা। এরমধ্যে ১.৪২ কোটি টাকা ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য। যা প্রদান করা হয়নি।

লুব-রেফের আর্থিক হিসাবে অন্যান্য পাওনাদার হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ১৪.৩০ কোটি টাকার দায় দেখানো হয়েছে। যা আগের বছর থেকে হিসাবের জের টেনে আনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে লেজার বা পাওনাদের ঠিকানা দেয়নি। এ কারনে সত্যতা যাচাইয়ে ওইসব পাওনাদারদেরকে চিঠি দিতে পারেনি নিরীক্ষক। এছাড়া বিকল্প নিরীক্ষা পদ্ধতি হিসেবে কোম্পানির কাছে ৩ মাসের লেজার চেয়েছিল নিরীক্ষক। সেটাও দেয়নি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এতে করে ওই ১৪.৩০ কোটি টাকার হিসাবের সত্যতা পায়নি নিরীক্ষক।

এদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.৩৩ কোটি টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কিনেছে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু মূসক ৯.১ অনুযায়ি ওই অর্থবছরে ৩১.৭৫ কোটি টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কেনা হয়েছে।

২০২১ সালে শেয়ারবাজারে আসে লুব-রেফ বাংলাদেশ। ওই সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২.৫৬ টাকা মুনাফা দেখানো কোম্পানিটির বুক বিল্ডিংয়ে কাট-অফ প্রাইস হয় ৩০ টাকা। আর সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৭ টাকা করে শেয়ার ইস্যু করা হয়।

এমন প্রিমিয়াম নেওয়া লুব-রেফের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে (৪.৫৬) টাকা। ওই অর্থবছরের ব্যবসায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোন লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি। তবে কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসানের মুখ দেখে। ওই অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় (০.৭৪) টাকা। ওই অর্থবছরের ব্যবসায় ১% নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। যে কোম্পানিটি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ব্যবসায় ২% লভ্যাংশ দিয়েছিল। এই নামমাত্র লভ্যাংশও ঠিকমতো শেয়ারহোল্ডারদের দিতে পারেনি। এ কারনে কোম্পানির ঘোষিত লভ্যাংশ না পেয়ে অনেক শেয়ারহোল্ডার বিএসইসিতে অভিযোগও করেন।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির অর্থবছরে (২০২০-২১) কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছিল ৩.৪১ টাকা। যা কমে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২.১৩ টাকা ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে হয় ১.৪১ টাকা।

এসব বিষয়ে জানতে লুব-রেফের সচিব কবির হোসাইনের হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দিলেও তিনি প্রতিউত্তর করেননি।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে