ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬

লাইফ ফান্ড থেকে ২,৩৬৭ কোটি টাকা লোপাট, দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ

২০২৬ আগস্ট ০৫ ১০:১৬:৩২
লাইফ ফান্ড থেকে ২,৩৬৭ কোটি টাকা লোপাট, দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দেশের বেসরকারি জীবনবীমা খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স আর্থিক সংকটে দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। বিশেষ নিরীক্ষায় কোম্পানিটির লাইফ ও সঞ্চয় তহবিল থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য উঠে এসেছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করলেও সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি গ্রাহকের সব পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

আইডিআরএর সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মোট সম্পদের মূল্য ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। বিপরীতে বকেয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীমা দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা, যা বিদ্যমান সম্পদের চেয়ে ১৬১ কোটি টাকা বেশি।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত আর্থিক ঘাটতি আরও বড়। কারণ কোম্পানির সম্পদের বড় অংশই জমি, ভবন ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদে বিনিয়োগ করা, যা দ্রুত বিক্রি করা কঠিন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এসব সম্পদ বিক্রি করলে বাজারমূল্যের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দাম পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘাটতি এক হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

আইডিআরএর নির্দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানি পরিচালিত বিশেষ নিরীক্ষায় আরও দেখা যায়, লাইফ ও সঞ্চয় তহবিল থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ৪৩২ কোটি টাকার লেনদেনে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তোপখানা রোড ও কাকরাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে সম্পদ কেনার নামে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানির ব্যাংক আমানত বন্ধক রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও সেগুলোর বড় অংশ এখন খেলাপি।

আইন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত এক বছরে ফারইস্ট মোট বকেয়া দাবির মাত্র ৬ শতাংশ পরিশোধ করেছে। ফলে একই সময়ে অন্তত ১১ হাজার গ্রাহক তাদের চলমান বীমা পলিসি বাতিল করেছেন। বর্তমানে দেশের ৩৬টি জীবনবীমা কোম্পানির মোট পুঞ্জীভূত বকেয়া দাবির প্রায় ৭০ শতাংশই এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মঈন উদ্দিন বলেন, ফারইস্টের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বছরের পর বছর গ্রাহকদের সঞ্চয়ের হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হলেও যথাযথ তদারকি না থাকায় সংকট আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার মতে, কোম্পানির সব সম্পদ বিক্রি করলেও গ্রাহকদের শতভাগ পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না, যা পুরো বীমা খাতের প্রতি জনআস্থার জন্য বড় হুমকি।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মো. আব্দুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন মালিকপক্ষ ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ করেছে। বর্তমানে কোম্পানির হাতে নগদ অর্থ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রিমিয়াম থেকে আসা সীমিত অর্থ দিয়েই বীমা দাবি পরিশোধের চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, অতীতে কোম্পানির স্থাবর সম্পদ অতিমূল্যায়িত দামে কেনা হয়েছিল। আইডিআরএর অনুমোদন ছাড়া সেগুলো বিক্রি করা সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনার পর সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণে তিনটি স্বাধীন মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ফারইস্টসহ সাতটি জীবনবীমা কোম্পানিকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধে এসব কোম্পানিকে শেয়ার ও স্থাবর সম্পদ বিক্রিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কত টাকা পরিশোধ করা হবে, তার পরিকল্পনা আগস্টের মধ্যেই জমা দিতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে