ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

মুনাফার আড়ালে সংকট: স্টাফদের বেতনও আসে না মূল ব্যবসায় 

২০২৬ আগস্ট ২৭ ১০:৩১:৫০
মুনাফার আড়ালে সংকট: স্টাফদের বেতনও আসে না মূল ব্যবসায় 

বেসরকারি ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি মূল ব্যাংকিং ব্যবসায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। ঋণ ও আমানতনির্ভর আয়ের জায়গায় বড় ধরনের পতন হলেও বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয়ের জোরে মুনাফা ধরে রেখেছে ব্যাংকটি—এমন চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে। ব্যাংকটির এমনই মন্দা অবস্থা যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনাদিবাবদ ব্যয়ের ৮০ শতাংশও আয় হয় না মূল ব্যবসায়।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের নিট সুদ আয় ছিল ১ হাজার ৩৪৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে নিট সুদ আয় কমেছে ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বা ১৩ শতাংশ, যা মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংকটি ঋণ কার্যক্রমের বদলে বিনিয়োগ আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, প্রাইজ বন্ড ও বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালে যেখানে মোট বিনিয়োগ ছিল ২০ হাজার ৪৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৬২৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ হাজার ১৯০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ৬০ শতাংশ।

এর ফলে বিনিয়োগ আয়ও বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ২ হাজার ১২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। এক বছরে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ১ হাজার ৬৬৭ কোটি ৩ লাখ টাকা বা ৭৮ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটি কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ থেকে আয় করেছে ৭৯৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং অন্যান্য পরিচালন খাত থেকে আয় করেছে ২৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এসব আয়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকটি মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ২১৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৮০ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৩৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা ৩০ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ ও অন্যান্য পরিচালন আয় বাদ দিলে ব্যাংকটি কার্যত লোকসানে পড়ত। কারণ ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ছিল ১ হাজার ১৭৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, অথচ একই বছরে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে বেতনাদিবাবদই ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৪৮১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ বিবেচনায় মূল ব্যবসার আয় দিয়ে শুধুমাত্র ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনাদিবাবদ ব্যয়ের ৮০ শতাংশ এসেছে।

অথচ ব্যাংকটির এর বাহিরেও অনেক ব্যয় রয়েছে। যাতে ২০২৫ সালে বেতনাদিসহ ব্যাংকটির মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬০৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ব্যয় যোগ হয়েছে আরও ৬৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

এ ব্যাংকটির ৪ বছর আগে ২০২১ সালেও ২০২৫ সালের থেকে বেশি বা নিট সুদজনিত আয় হয়েছিল ১ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে ওই বছরে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছিল ৫৭৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর বিনিয়োগ ছিল ৫ হাজার ১৫৯ কোটি ৮ লাখ টাকা।

এ হিসাবে ৪ বছরের ব্যবধানে নিট সুদ আয় কমেছে ২২১ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা ১৬ শতাংশ। তবে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৩ হাজার ২১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা ৫৫৬ শতাংশ। এই আয় বাড়াতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ৪ বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৬৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বা ৫৩২ শতাংশ।

উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর ব্র্যাক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ছিল ১ হাজার ৯৯০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং নিট সম্পদ ছিল ৯ হাজার ৯৭০ কোটি ১৬ লাখ টাকার।

ব্যাংকটি থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৬৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ৮৮ হাজার ৯৫১ কোটি ৭৪ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। এরমধ্যে ২৩ হাজার ৬১৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার কারেন্ট ডিপোজিট রয়েছে। এছাড়া ১২ হাজার ৯৭৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকার সেভিংস ডিপোজিট, ৫১ হাজার ৭৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট, ৯৭৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার অন্যান্য ডিপোজিট ও ৩০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিল রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির সচিব এম মাহবুবুর ও জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে