ঢাকা, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শেয়ারবাজারে আতঙ্কের আগস্ট

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০২ ০৯:৩৮:৩৫
শেয়ারবাজারে আতঙ্কের আগস্ট

দেশের শেয়ারবাজারে সদ্য সমাপ্ত আগস্ট মাস ছিল বিনিয়োগকারীদের জন্য হতাশা ও আতঙ্কের। এ মাসে বাজারের প্রধান মূল্যসূচক কমেছে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট। একই সঙ্গে ডিএসইর বাজার মূলধন থেকে উধাও হয়েছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার বেশি। দরপতনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণও প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন মার্জিন ঋণ নীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাজারে হস্তক্ষেপে অনীহা, ডিএসইর আকস্মিকভাবে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজে পরিদর্শন এবং আতঙ্কে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা আগস্টের দরপতনকে আরও তীব্র করেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাজারের পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।

আগস্টের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার ১৩৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। মাসের শেষ কার্যদিবস ৩১ আগস্ট লেনদেন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১০ হাজার ৩৯৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

বাজার মূলধনের এই পতনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিওতে। আগস্টজুড়ে শেয়ারদর কমায় সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ারের বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে।

আগস্টের শুরুতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টে। ৩১ আগস্ট লেনদেন শেষে সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৫৯৮ পয়েন্টে। ফলে এক মাসে সূচক কমেছে ২৯৮ পয়েন্ট, যা প্রায় ৫ শতাংশ পতনের সমান।

সূচক ও বাজার মূলধনের পতনের পাশাপাশি লেনদেনের বড় ধরনের সংকোচনও বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগস্টের শুরুতে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। মাসের শেষ কার্যদিবসে তা নেমে আসে মাত্র ৪৭৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে লেনদেন কমেছে ৫৬৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৫৪ শতাংশ।

সাধারণত দরপতনের সময় লেনদেন স্বাভাবিক থাকলে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি বজায় থাকে। এতে কম দামে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দরপতনের সঙ্গে লেনদেনও দ্রুত কমে গেলে তা বাজারে ক্রেতার সংকট, তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার বড় সংকেত হিসেবে দেখা হয়। আগস্টে শেয়ারবাজারে ঠিক এমন পরিস্থিতিই দেখা গেছে।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বিএসইসি ও ডিএসই নিয়মিতভাবে কাজ করছে। কোনো ব্রোকারেজ হাউজ থেকে যেন আরেকটি ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য কিছু ব্রোকারেজ হাউজে আকস্মিক পরিদর্শন করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি অনেকে ভুলভাবে বুঝে আতঙ্কিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও শেয়ারবাজারের জন্য সহায়ক ছিল না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

এসব কারণে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান ডিএসইর এই পরিচালক। এর ফলে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও লভ্যাংশ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শেয়ারের দামে।

এক মাসে বাজার মূলধন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি কমে যাওয়া এবং লেনদেন ৫৪ শতাংশ কমে আসা শেয়ারবাজারের দুর্বলতার গভীরতাই তুলে ধরছে। শুধু সূচক বাড়িয়ে এই পরিস্থিতি থেকে বাজারকে বের করে আনা সম্ভব নয়। বরং বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বাজারে তারল্য বাড়ানো এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তি শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শেয়ারবাজারের চলমান মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে