ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন সংকট আরও গভীর হবে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৪:০০:৫৯
খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন সংকট আরও গভীর হবে

দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি অংশ আবার খেলাপি হতে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন হলে এসব ঋণের বিপরীতে বাড়তি প্রভিশন রাখতে হতে পারে। এতে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে শুধু নতুন করে মূলধন জোগান দিয়ে দুর্বল ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।

শনিবার ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে খেলাপি ঋণ

মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এখন তা ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদসহ খেলাপি ঋণ প্রায় ২৫ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে তা ৩২ শতাংশের বেশি হয়েছে।

তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নীতিগত সহায়তায় পুনঃতফসিল করা ঋণের একটি অংশ আবার খেলাপি হলে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে।

প্রকৃত ক্ষতি বের হলে বাড়বে প্রভিশন

আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তখন অনেক ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।

একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো যখন ঋণের বিপরীতে জামানত খুঁজতে শুরু করবে, তখন সেই সম্পদের প্রকৃত মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এতে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাহবুবুর রহমানের ভাষায়, ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি নির্ধারণ না করে শুধু মূলধন দিয়ে সংকটের সমাধান করা যাবে না।

তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা হলে এবং এর ৩০ শতাংশ খেলাপি হলে ১৮ হাজার কোটি টাকা কার্যত আটকে যায়। এই অর্থ ফেরত না এলে আমানতকারীদের দায় পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হয়।

‘আজকে ৫০ হাজার কোটি টাকা দিলাম, কালকে ব্যাংক ঠিক হয়ে যাবে—এমন কোনো বিষয় নেই।’

ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমছে

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘প্রিক্যারিয়াস সিচুয়েশন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ব্যাংকেরই এখন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। মূলধন পর্যাপ্ততা দুর্বল এবং সব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিও এক নয়।

পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর ৫৭টি ব্যাংক কার্যক্রম চালালেও কতগুলো ব্যাংক এখন পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঋণ কমিয়ে সরকারি সিকিউরিটিতে ঝোঁক

ব্যাংকের মূল ব্যবসা ঋণ দেওয়া ও আমানত সংগ্রহ করা হলেও অনেক ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিম কমে সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

তার মতে, এতে কোনো কোনো ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি মুনাফা বাড়তে পারে। কিন্তু মূল ব্যবসা থেকে আয় কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের ব্যবসায়িক সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।

‘ব্যাংকের কোর ব্যবসা টাকা দেওয়া এবং টাকা নেওয়া। তাই নিট ইন্টারেস্ট ইনকাম কমে যাওয়া ব্যাংক ও পুরো ব্যাংকিং শিল্পের জন্য অশুভ সংকেত।’

সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেলে ব্যাংকগুলোকে মূল ব্যবসা থেকে আয় বাড়াতে হবে। এ জন্য কম খরচে আমানত সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলেই সমাধান নয়

পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তার মতে, একীভূতকরণের মাধ্যমে শাখা, জনবল ও পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত। কিন্তু একীভূত হওয়ার পরও যদি একই ধরনের কাঠামো বহাল থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।

সংকট এখন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার

ব্যাংকিং খাতের সমস্যা কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একটি ব্যাংকে সমস্যা হলে তার প্রভাব অন্য ব্যাংকেও পড়তে পারে। তাই পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েই সংস্কার করতে হবে।

তার মতে, ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ও মূলধনের প্রকৃত অবস্থা আগে নির্ধারণ করা জরুরি।

সুশাসন ছাড়া অর্থ ঢেলে লাভ নেই

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে সুশাসনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন মাহবুবুর রহমান।

তিনি বলেন, ব্যালান্সশিটের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, যথাযথ প্রভিশন রাখা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়ন এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা, ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া এবং অনিয়মের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে না পারলে সংস্কারের উদ্যোগ টেকসই হবে না।

তার মতে, ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো এখন চিহ্নিত। এখন প্রয়োজন প্রকৃত ক্ষতি নির্ধারণ, লক্ষ্যভিত্তিক পুনর্গঠন এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে