ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৭২৭ কোটি টাকার ঋণ-আমানতে প্রমাণ নেই

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ০৯:৩০:৩৩
৭২৭ কোটি টাকার ঋণ-আমানতে প্রমাণ নেই

দীর্ঘদিনের লোকসান ও মূলধন ঘাটতির কারণে আর্থিক সংকটে থাকা বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) আরও দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির মোট দায় সম্পদের চেয়ে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি হয়েছে। একই সময়ে পূঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

শুধু তাই নয়, কোম্পানিটির ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ ও আমানতের হিসাবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা-প্রমাণ পাননি নিরীক্ষক। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক নগদ ও তারল্য সংরক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে। এসব কারণে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক।

বিআইএফসির ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব জানিয়েছেন আহসান মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মো. আবদুল্লাহ আল আমিন।

বছরের পর বছর লোকসানের কারণে ২০২৫ সালের শেষে বিআইএফসির পূঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটির মোট দায় তার মোট সম্পদের চেয়ে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

বিআইএফসির দেওয়া ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের একটি বড় অংশের বিপরীতে সানম্যান গ্রুপের কোম্পানির গ্যারান্টি রয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি বিভিন্ন পক্ষকে মোট ৭৬২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ঋণ, লিজ ও অগ্রিম দিয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে সানম্যান গ্রুপের কোম্পানি গোল্ডেন হরাইজন লিমিটেডকে। আর বাকি ৭০৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে অন্যান্য পক্ষকে।

এসব ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের মধ্যে ৬১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বিপরীতে সানম্যান গ্রুপের কোম্পানির গ্যারান্টি রয়েছে। অর্থাৎ মোট ঋণ, লিজ ও অগ্রিমের প্রায় ৮১ শতাংশই ওই গ্রুপের গ্যারান্টির আওতায়। নিরীক্ষকের মতে, এ বিষয়টি ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ২৫ ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিআইএফসির আর্থিক বিবরণীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের হিসাবের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে সত্যতা পাননি নিরীক্ষক। এর মধ্যে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও এজেন্টের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ হিসেবে ৩৪৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদি আমানত রয়েছে ২১১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য উৎসের মেয়াদি আমানত রয়েছে ১৬৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এসব খাতে ৭২৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে সত্যতার চিঠি না পাওয়ায় এবং বিকল্প নিরীক্ষা পদ্ধতিতেও পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারায় এসব হিসাবের যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক। এ ছাড়া কয়েকটি ব্যাংক ও কোম্পানির হিসাবেও অমিল পাওয়া গেছে, যা নিরীক্ষার তারিখ পর্যন্ত সমন্বয় করা হয়নি।

কোম্পানিটির বাধ্যতামূলক নগদ সংরক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নগদ সংরক্ষণ অনুপাতে (সিআরআর) ঘাটতি ছিল ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। একই সময়ে বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণে (এসএলআর) ঘাটতি ছিল ১৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এতে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

বিআইএফসির স্থায়ী সম্পদের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির স্থায়ী সম্পদের মূল্য ছিল ৪৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে পল্টনে থাকা একটি জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা। তবে জমিটির মালিকানা ও মূল্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মিউটেশন রেকর্ড, সীমানা নির্ধারণের নথি, হালনাগাদ বিএস, আরএস, এসএ ও সিএস খতিয়ান এবং ভূমি কর পরিশোধের নথি পাওয়া যায়নি। ফলে জমিটির মালিকানা ও মূল্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক।

এ ছাড়া জমিটি সর্বশেষ ২০১২ সালে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এরপর আর পুনর্মূল্যায়ন না হওয়ায় ২০২৫ সালের হিসাবে দেখানো মূল্য কতটা প্রকৃত বা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিও নিশ্চিত করা যায়নি।

টেলিপ্লাস নিউইয়র্ক লিমিটেডের একটি ঋণ হিসাবেও আপত্তি জানিয়েছেন নিরীক্ষক। চুক্তির আওতায় থাকা ঋণের হিসাবে ১৮ কোটি ৮ লাখ টাকা অপরিশোধিত সুদ যোগ করে বকেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এভাবে সুদ যোগ করার হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিএফআইএম সার্কুলারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিআইএফসির ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকার অবন্টিত লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করা হয়নি। তবে বিএসইসির ২০২১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় ধরে অপরিশোধিত বা দাবিহীন থাকা লভ্যাংশ সিএমএসএফে স্থানান্তরের কথা।

২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা উৎসে কর বকেয়া ছিল। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কোম্পানিটি অতিরিক্ত দায়ের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিরীক্ষক।

এ ছাড়া গ্র্যাচুইটি ও পেনশন তহবিলের দায় নির্ধারণে আইএএস-১৯ অনুযায়ী অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে এ খাতে কোম্পানির সংরক্ষিত অর্থ যথেষ্ট কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

বিআইএফসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য কোম্পানিটির আর্থিক দুর্বলতার একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরছে। বিপুল সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির পাশাপাশি ঋণ-আমানতের হিসাব যাচাইয়ে সীমাবদ্ধতা, নিয়ন্ত্রক সংরক্ষণে ঘাটতি এবং সম্পদের নথিপত্রের দুর্বলতা কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে কোম্পানি সচিব আনিসুর রহমান আগামীর সময়কে বলেন, ২০১৫ সালে এস.আলম ও পিকে হাওলাদার কোম্পানিটির দখল নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম করে। এতে কোম্পানি অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে এখন কোম্পানির ব্যবসা নাই। তারপরেও চেষ্টা করে যাচ্ছি যদি সমস্যা কাটিয়ে উঠা যায়।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে