ঢাকা, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে পাওনা-অগ্রিমে আটকা ৪২ কোটি টাকা

২০২৬ নভেম্বর ০২ ০৯:০০:২৮
তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে পাওনা-অগ্রিমে আটকা ৪২ কোটি টাকা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির আর্থিক বিবরণীতে একের পর এক ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। কোম্পানিটির অগ্রিম বেতনেই আটকে আছে ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। এক বছরে এ খাতে অর্থ বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি। এর বাইরে অন্যান্য পাওনা ও অগ্রিমের পরিমাণ ২৬ কোটি টাকার বেশি। সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ হিসেবে দেওয়া অর্থও পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি।

শুধু পাওনা-অগ্রিম নয়, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বাজারমূল্যও কমেছে প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার কর-দাবি এবং পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে আইনি জটিলতা। এসব ঝুঁকির মধ্যে ২০২৫ সালে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ।

কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। আর্থিক বিবরণীর এসব হিসাব কোম্পানির সম্পদের গুণগত মান, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ দায় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এক বছরে অগ্রিম বেতন বেড়েছে ৬০ শতাংশ

তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২০২৫ সালের শেষে অগ্রিম বেতনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৪ টাকা। আগের বছর এ খাতে ছিল ৮ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯৪ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে অগ্রিম বেতন বেড়েছে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪০ টাকা বা ৬০ দশমিক ২ শতাংশ।

একটি বীমা কোম্পানির অগ্রিম বেতনের খাতে এত বড় অঙ্কের অর্থ জমে থাকা এবং এক বছরে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অন্যান্য পাওনা-অগ্রিম ২৬ কোটি টাকার বেশি

কোম্পানিটির অন্যান্য পাওনা ও অগ্রিমের অঙ্কও বড়। ২০২৫ সালের শেষে অফিস সাজসজ্জায় অগ্রিম ২ কোটি ৬১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, অফিস ভাড়ায় ৫৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং কমিশন পাওনা ১ কোটি ৪১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এ ছাড়া পুনঃবীমা পোর্টফোলিওতে প্রিমিয়াম পাওনা রয়েছে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ১১ হাজার টাকা।

সব মিলিয়ে ‘সানড্রি ডেবটরস’ বা অন্যান্য পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ অঙ্ক বেড়েছে ৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

অর্থাৎ অগ্রিম বেতন ও অন্যান্য পাওনা মিলিয়ে কোম্পানিটির প্রায় ৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকা আটকে রয়েছে। এসব অর্থ কত দ্রুত আদায় বা সমন্বয় হবে, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ, নতুন বিনিয়োগও

কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান তাকাফুল ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেডের কাছেও উল্লেখযোগ্য অর্থ পাওনা রয়েছে। আর্থিক বিবরণীতে ‘লোন পেইড টু টিআইএসএল’ হিসেবে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এ অঙ্ক ২ কোটি টাকা কমলেও পুরো অর্থ সমন্বয় হয়নি।

একই সময়ে সহযোগী প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন করে ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স। ফলে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া ঋণের আদায়, ঋণের শর্ত এবং নতুন বিনিয়োগের আর্থিক যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে বড় মূল্যহ্রাস

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগেও বড় ধরনের মূল্যহ্রাসের মুখে পড়েছে কোম্পানিটি। ২০২৫ সালের শেষে শেয়ার বিনিয়োগের ক্রয়মূল্য ছিল ১২ কোটি ৪১ হাজার টাকা। বিপরীতে বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

ক্রয়মূল্যের তুলনায় বাজারমূল্য কমেছে ৬ কোটি ৯১ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এর ফলে কোম্পানির ন্যায্য মূল্য সংরক্ষণী বা ফেয়ার ভ্যালু রিজার্ভ ঋণাত্মক হয়ে একই অঙ্কে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরেও এ খাতে বড় অঙ্কের ঋণাত্মক অবস্থান ছিল।

৪৫ কোটি টাকার কর-দাবি, চলছে মামলা

কোম্পানিটির আর্থিক ঝুঁকির আরেকটি বড় জায়গা আয়কর বিরোধ। বিভিন্ন করবর্ষে আয়কর কর্তৃপক্ষের দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এসব দাবির বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট ও আপিল চলছে। মামলাগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল অনিশ্চিত হওয়ায় সম্ভাব্য দায়ের বিপরীতে আর্থিক বিবরণীতে কোনো সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখা হয়নি। ফলে মামলার রায় কোম্পানির বিপক্ষে গেলে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

ঝুঁকির মধ্যেই মুনাফা কমেছে ১৮ শতাংশ

এত সব পাওনা, বিনিয়োগের মূল্যহ্রাস ও কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে কোম্পানিটির মুনাফাও কমেছে। ২০২৫ সালে তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের নিট মুনাফা হয়েছে ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা। আগের বছর এ অঙ্ক ছিল ৯ কোটি ৪৫ লাখ ২৭ হাজার টাকা।

এক বছরে নিট মুনাফা কমেছে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বা প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ। শেয়ারপ্রতি আয়ও ১ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে কমে ১ টাকা ২৪ পয়সায় নেমেছে।

বড় অঙ্কের পাওনা-অগ্রিম, সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে অনাদায়ি ঋণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মূল্যহ্রাস এবং কর-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে মুনাফার এই পতন কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব শাহীন মিয়াকে ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে