ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে শেয়ারবাজারের বিকল্প নেই

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৯:৩৭:০৭
বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে শেয়ারবাজারের বিকল্প নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে শেয়ারবাজারের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজার বিষয়ক) তানভীর শাহরিয়ার গনি। তিনি বলেন, অর্থনীতির এই অগ্রযাত্রায় যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, তা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য দেশের শেয়ারবাজারকে কাজে লাগাতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) 'ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬' উপলক্ষে আয়োজিত "বিল্ডিং ইনভেস্টর কনফিডেন্স: দ্য রোল অব প্রফেশনাল বডিস ইন অডিট রিপোর্টিং, গভর্নেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট" শীর্ষক এক যৌথ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইন্সটিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি), ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস বাংলাদেশ (আইআইএবি) এবং এসিসিএ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিকে সঙ্গে নিয়ে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু ৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে যেতে হলে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ অনেক বেশি হবে। তখন ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন দিয়ে চাহিদা পূরণ হবে না; প্রয়োজন হবে ২৫, ৫০ এমনকি ১০০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার। ফলে অর্থনীতির পরবর্তী ধাপে যেতে হলে শেয়ারবাজারের উন্নয়ন অপরিহার্য।

তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজারে আসার প্রকৃত অর্থ কী, তা জাতিকে বুঝতে হবে। এ জন্য আর্থিক সাক্ষরতা বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদন, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা, করপোরেট সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদন কেবল কিছু হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়; বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ভিত্তি। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে না এসেও কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন অনুপাত ও বিশ্লেষকদের মতামত দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিবেদনের সততা ও নির্ভরযোগ্যতাই বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরির প্রধান শর্ত।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য থাকলে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপরও। তাই আর্থিক প্রতিবেদনে সত্য ও নির্ভুল তথ্য তুলে ধরতে হবে।

বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ সহকারী বলেন, আন্তর্জাতিক শেয়ার অত্যন্ত গতিশীল। বিনিয়োগকারীরা যেখানে ভালো সুযোগ ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ পান, সেখানেই অর্থ নিয়ে যান। উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশটিতে এখন বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক শেয়ার প্রবেশ করেছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রাখা জরুরি। আর্থিক প্রতিবেদনের মান, আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুসরণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিবেদন ও হিসাবরক্ষণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন পেশাগত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই শুধু আন্তর্জাতিক মান গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। একই খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্য মূল্যায়নে অভিন্ন মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিগুলোর মধ্যে কার্যকর তুলনা করতে পারেন।

তিনি পেশাগত সততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, আর্থিক বাজারে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হলে পেশাজীবীদের মধ্যে স্বনিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক প্রতিবেদনের মান উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার প্রবণতা অর্থনীতির জন্য কার্যকর নয়। একটি ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন, তেমনি তালিকাভুক্ত ব্যাংক হিসেবে সেটি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতাধীনও। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত অন্য প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন খাত ও বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করতে পারে। এ জন্য নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা মূলত জানতে চান, বিনিয়োগের সুযোগ কোথায়, তাঁদের অর্থের নিরাপত্তা কতটা এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কতটুকু। পাশাপাশি করনীতির স্থিতিশীলতা, আইনি সহায়তা এবং নির্ভরযোগ্য হিসাব ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামনে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ভারতের শেয়ারবাজারের অগ্রগতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সঠিক নীতি, বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যকর শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশও বর্তমান অবস্থান থেকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে