ঢাকা, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

অডিট ফি কম নিলে কঠোর ব্যবস্থা, ডিলিস্ট করা হবে: বিএসইসি চেয়ারম্যান

২০২৬ অক্টোবর ০৫ ১৯:৪১:২০
অডিট ফি কম নিলে কঠোর ব্যবস্থা, ডিলিস্ট করা হবে: বিএসইসি চেয়ারম্যান

তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিরীক্ষা (অডিট) কাজে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কম নিয়ে কাজ করা অডিটরদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, নিরীক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে একটি ফি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। এরপর কেউ নির্ধারিত ফি’র নিচে কাজ করলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অডিটরকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

সোমবার (৫ অক্টোবর) 'ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬' উপলক্ষে আয়োজিত "বিল্ডিং ইনভেস্টর কনফিডেন্স: দ্য রোল অব প্রফেশনাল বডিস ইন অডিট রিপোর্টিং, গভর্নেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট" শীর্ষক এক যৌথ সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), ইন্সটিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি), ইনস্টিটিউট অব ইন্টারনাল অডিটরস বাংলাদেশ (আইআইএবি) এবং এসিসিএ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অডিট ফি নিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, নিরীক্ষার মান নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য—তা হলো অডিট ফি। অনেক সময় অডিটররা কম ফি নিয়ে কাজ করেন। এ কারণে বিভিন্ন শ্রেণির কোম্পানির টার্নওভার বা মোট সম্পদের ভিত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ফি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ফি কাঠামো নির্ধারণের পর সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেউ নির্ধারিত ফি’র নিচে কাজ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (এফআরসি) জানানো হবে।

আইপিওতে অডিটরদের দায়িত্ব বাড়ছে

আইপিও প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকর করতে অডিটরদের দায়িত্ব বাড়ানোর কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এত দিন আইপিওর আবেদনের ক্ষেত্রে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বিএসইসি বিভিন্ন নথি যাচাই করত। একটি নথিতে অসঙ্গতি থাকলে কোম্পানির কাছে আবার ব্যাখ্যা চাওয়া হতো। সরকারি ব্যবস্থায় একটি চিঠি ওপর-নিচে চলাচল করতেই অনেক সময় লেগে যায়। একাধিক প্রশ্ন উঠলে আইপিও প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যেত।

এ কারণে এখন অডিটরকে দিয়ে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এর আওতায় ডিএসই ও বিএসইসি যে নথি যাচাই করত, সেই কাজ অডিটর করবেন।

চেয়ারম্যান বলেন, শুধু নথি যাচাই নয়, আইপিওর ক্ষেত্রে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কীভাবে গড়ে উঠেছে, অর্থাৎ ‘ক্যাপিটাল বিল্ডআপ’ কীভাবে হয়েছে, সেটিও অডিটরের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এতে আইপিও অনুমোদনের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।

তিন মাসের বেশি আইপিও প্রক্রিয়া চান না বিএসইসি

মাসুদ খান বলেন, নতুন ব্যবস্থায় একটি আইপিও সম্পন্ন হতে তিন মাসের বেশি সময় লাগার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। বরং প্রয়োজনীয় কাজগুলো ঠিকভাবে সম্পন্ন হলে তিন মাসও বেশি সময় বলে মনে হতে পারে।

তিনি জানান, নতুন আইপিও বিধিমালায় মূল্য নির্ধারণ, প্রাইস ডিসকভারি ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশের বাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীর আধিক্যের কারণে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শুধু পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়

অডিটর এনলিস্টমেন্টের ক্ষেত্রেও প্রচলিত যোগ্যতার কাঠামো পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, কোনো অডিটরের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেই তিনি তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট করার জন্য উপযুক্ত—এমন ধারণা ঠিক নয়।

তার ভাষায়, পাঁচ বছর কোনো ছোট স্কুলের অডিট করে এসে একজন অডিটর তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট করবেন—এটা যৌক্তিক নয়। বরং সাম্প্রতিক এক থেকে তিন বছরে তিনি যে অডিটগুলো করেছেন, সেগুলোর আকার ও জটিলতা কী ছিল, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, অডিটর এনলিস্টমেন্টের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক মানদণ্ড তৈরির বিষয়টি বিএসইসি বিবেচনা করছে।

তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিটে নতুন মানদণ্ড

তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিটের জন্য আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণের কথাও বলেন চেয়ারম্যান। বিশেষ করে আইপিওতে ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’ ব্যবস্থা চালুর পর অডিটরদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির অডিট কে করতে পারবেন, তার জন্য উপযুক্ত মানদণ্ড থাকা দরকার। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) কাছ থেকেও প্রস্তাবের অপেক্ষায় রয়েছে বিএসইসি।

শুধু হিসাব মিললেই হবে না, ব্যবসা বুঝতে হবে

আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অডিটরদের ব্যবসার ধরন বোঝার ওপরও গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী কী কী তথ্য প্রকাশ করতে হবে, সেদিকে নজর দিলেই হবে না; আর্থিক বিবরণীর সংখ্যাগুলো বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও দেখতে হবে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো কোম্পানির মুনাফা অনেক বেড়ে গেল, অথচ একই সময়ে নগদ প্রবাহ কমে গেল—এটি একটি সতর্কসংকেত। এ ক্ষেত্রে কার্যকরী মূলধনের পরিবর্তন বাস্তব কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

ইনভেন্টরি, পাওনা, দেনা এবং নগদ রূপান্তর চক্রের মতো অনুপাত বিশ্লেষণ করেও আর্থিক বিবরণীর সংখ্যাগুলো যৌক্তিক কি না বোঝা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষ করে ব্যবসার ধরন না বুঝে অডিট করা ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী ‘মেক-টু-অর্ডার’ কোম্পানির সাধারণত দীর্ঘ সময়ের মজুত থাকার কথা নয়। এ ধরনের কোম্পানির ছয় থেকে আট মাসের ইনভেন্টরি থাকলে আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো সমস্যা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অডিট ‘ভেরিফিকেশন’ বা ফরেনসিক তদন্ত নয়

স্ট্যাটিউটরি অডিটের উদ্দেশ্য নিয়েও ব্যাখ্যা দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, স্ট্যাটিউটরি অডিটের মূল উদ্দেশ্য হলো কোম্পানির আর্থিক অবস্থার ‘সত্য ও ন্যায্য চিত্র’ তুলে ধরা। এটি প্রতিটি নথি যাচাই বা ফরেনসিক তদন্তের কাজ নয়।

এই পার্থক্যের কারণেই আইপিও প্রক্রিয়ায় নথি যাচাইয়ের জন্য অডিটরদের ওপর ‘এক্সটেন্ডেড অডিট’-এর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, অডিটরসহ সব পেশাজীবীর পেশাগত আচরণ ও নৈতিকতার মান বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে আর্থিক বাজারে আস্থা ফেরাতে অডিটের মান বাড়ানো এবং অডিটরদের প্রকৃত সক্ষমতার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে