ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আয়ের বড় অংশই যাচ্ছে সুদে, নগদ সংকটে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ১০:১৩:৩৩
আয়ের বড় অংশই যাচ্ছে সুদে, নগদ সংকটে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ

ব্যবসায় আয় ও সম্পদ বাড়লেও আর্থিক চাপ থেকে বের হতে পারছে না দেশের ওষুধ খাতের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড। ২০২৫-২৬ হিসাববছরের প্রথম নয় মাসের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে কোম্পানিটির ঋণের বোঝা, সুদ ব্যয়, বকেয়া কর এবং নগদ অর্থের সংকট নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে একই সময়ে ঋণনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদের খরচ। ফলে ব্যবসা থেকে আয় বাড়লেও তার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে আর্থিক ব্যয় মেটাতে।

৯৬৫ কোটি টাকার সম্পদ, নগদ মাত্র ২ কোটি

৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। বিপুল এই সম্পদের বিপরীতে কোম্পানিটির হাতে নগদ ও ব্যাংক উদ্বৃত্ত রয়েছে মাত্র ২ কোটি ২১ লাখ টাকা।

অর্থাৎ, মোট সম্পদের তুলনায় তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নগদের পরিমাণ অত্যন্ত কম। বড় ধরনের স্বল্পমেয়াদি দায়, পরিচালন ব্যয় কিংবা হঠাৎ নগদ অর্থের প্রয়োজন তৈরি হলে কোম্পানিটির ওপর চাপ বাড়তে পারে।

কাগজে-কলমে কোম্পানিটির চলতি অনুপাত ৪ দশমিক ২৭। কিন্তু চলতি সম্পদের বড় অংশ নগদে নেই। ২৪১ কোটি ১৫ লাখ টাকার চলতি সম্পদের মধ্যে মজুদ পণ্য রয়েছে ৭৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, বাণিজ্যিক পাওনা ৮০ কোটি ৯৭ লাখ এবং অগ্রিম ও আমানত ৮৩ কোটি ৯ লাখ টাকা।

ফলে এসব পাওনা আদায় ও মজুদ দ্রুত নগদে রূপান্তর করতে না পারলে কাগজে শক্তিশালী চলতি সম্পদের বিপরীতে বাস্তব নগদ সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঋণ বাড়ছে, লাফিয়ে বাড়ছে সুদ

কোম্পানিটির আর্থিক ঝুঁকির আরেকটি বড় দিক হলো ঋণ ও সুদের ব্যয় বৃদ্ধি। আগের বছরের একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আর্থিক ব্যয়ও। গত বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির আর্থিক ব্যয় ছিল ৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। চলতি সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আর্থিক ব্যয় বেড়েছে ১৭৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, এই সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি ১১৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২২৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হলেও সুদ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয়ের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

করের বকেয়াও বাড়ছে

কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে করের দায় নিয়েও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। নয় মাসের হিসাবে চলতি কর ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ব্যালান্স শিটে মোট চলতি কর পরিশোধযোগ্য বা বকেয়া করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

তবে নগদ প্রবাহ বিবরণী অনুযায়ী, এ সময়ে আয়কর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে বিদ্যমান করের দায় পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে কোম্পানিটির নগদ প্রবাহের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।

বড় বিনিয়োগ, ফেরত আসার অপেক্ষায় নগদ

এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ একই সময়ে বড় অঙ্কের মূলধনি বিনিয়োগও করেছে। প্রথম নয় মাসে নির্মাণাধীন প্রকল্প বা মূলধনি কাজ চলমান খাতে ২১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

নতুন এসব প্রকল্প থেকে দ্রুত আয় বা নগদ প্রবাহ তৈরি না হলে বিপুল মূলধনি ব্যয় কোম্পানিটির তারল্য পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ যখন মাত্র ২ কোটি ২১ লাখ টাকা, তখন বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের অর্থায়ন ও চলতি দায় মেটানোর সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিক্রি বাড়লেও বাড়ছে আর্থিক চাপ

এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের সর্বশেষ নয় মাসের আর্থিক সূচকে একদিকে ব্যবসা সম্প্রসারণের চিত্র দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে বাড়ছে আর্থিক চাপ।

বিক্রি বেড়েছে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ও আর্থিক ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে চলতি কর পরিশোধযোগ্য অর্থ বেড়েছে। বিপরীতে নগদ অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হলেও কোম্পানির মোট সম্পদের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।

সব মিলিয়ে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যবসার আকার বাড়ার পাশাপাশি ঋণ, সুদ ব্যয়, করের দায় এবং নগদ অর্থের মধ্যে একটি বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। ফলে বিক্রি বৃদ্ধির পাশাপাশি কোম্পানিটি কতটা নগদ প্রবাহ তৈরি করতে পারছে এবং ঋণের বোঝা কীভাবে সামলাচ্ছে—সেটিই সামনে আর্থিক স্থিতিশীলতার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে